Skip to main content

শ্রীলঙ্কার পর কোন দেশগুলির পালা

গত কয়েকমাস ধরে প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কায় ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট বাড়তে বাড়তে আজ যে চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের রূপ নিয়েছে, সে ব্যাপারে আমরা সকলেই অবহিত । ওই অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গেই শুরু হয়েছে ব্যপক গণবিক্ষোভ  , আন্দোলন । 
শ্রীলঙ্কার বিদেশী মুদ্রা ভান্ডার আজ ৫ কোটি ডলারের থেকেও কমে গেছে । 
গত কয়েকমাসে এই সংকটের চরম রূপ দেখা গেলেও গত বেশ কয়েকবছর ধরেই শ্রীলঙ্কার ফ্যাসিবাদী রাজাপাক্ষে সরকারের ভ্রান্ত অর্থনৈতিক নীতি এই সংকটের সৃষ্টি করেছে।  
সুযোগ বুঝে মাঠে নেমে পড়েছে বিশ্ব ব্যাঙ্ক ও আন্তর্জাতিক অর্থ ভান্ডার (IMF) ।  শ্রীলঙ্কাকে অর্থনৈতিক সংকটের থেকে বের করার (bail out)  জন্য ঋণ দেওয়ার নামে সাম্রাজ্যবাদী আন্তর্জাতিক লগ্নী পুঁজির স্বার্থবাহী নানা শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।  যেরকম পৃথিবীর অধিকাংশ দরিদ্র, অনুন্নত দেশের ক্ষেত্রে অতীতেও তারা করেছে । 
কিন্তু এর থেকেও চিন্তাজনক বিষয় হল যে শ্রীলঙ্কা একা নয় । পৃথিবীর আরও বহু দেশই আজ শ্রীলঙ্কার মতই চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে । রাষ্ট্রসঙ্ঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক শাখার (UNCTAD) সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী পৃথিবীর অধিকাংশ মধ্য ও নিম্ন আয়ের দেশগুলো আজ মূলত তিনটি সমস্যার কারণে প্রবল অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে ।  ১) কোভিড মহামারী জনিত অর্থনৈতিক মন্দা, ২) ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা এবং ঋণদাতাদের দ্বারা  সুদের হার বৃদ্ধি  ৩) সর্বশেষ কারণ হল রাশিয়া -ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে খাদ্য এবং জ্বালানির দাম বৃদ্ধি । 
বিশ্ব ব্যাঙ্কের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে  ৬০% নিম্ন আয়ের দেশ ঋণ সংকটে আছে । ইউক্রেনে যুদ্ধের কারণে ডলারের চাহিদা বেড়ে গেছে। মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ  (সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক)  সুদের হার বাড়িয়ে দিয়েছে ।  
বর্তমানে বিশ্বের  ১০৭টি দেশ  এই তিনটি সমস্যার অন্তত একটি সমস্যা দ্বারা প্রভাবিত ।
এবং এদের মধ্যে  ৬৯টি দেশ তিনটি সমস্যা দ্বারাই প্রভাবিত । এই ৬৯টি দেশের মধ্যে ২৫টি আফ্রিকায় অবস্থিত ,  ২৫টি এশিয়ায় এবং ১৯টি লাতিন আমেরিকা এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত । 
মিশর ও তিউনেশিয়া ইতিমধ্যেই গম আমদানি জনিত সমস্যার কারণে সংকটে,  পাকিস্তান শক্তি আমদানির সমস্যায় জর্জরিত ।  আফ্রিকায় ঘানা, কেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা,  ইথিওপিয়া ইত্যাদি দেশ  ; লাতিন আমেরিকায় আর্জেন্টিনা ,  এল সালভাদর,  পেরু ইত্যাদি দেশ চরম সংকটের মুখোমুখি । 
যদিও UNCTAD-র রিপোর্টে চরম সংকটাপন্ন দেশ হিসেবে ভারতের নাম নেই,  তবে এটা ভেবে নেওয়ার কোনও কারণ নেই যে ভারত সংকট থেকে মুক্ত থাকবে । প্রথমে নোটবন্দী,  তারপর কোভিড-লকডাউনের কারণে GDP  বৃদ্ধি আজ স্তিমিত,  খাদ্য দ্রব্য  থেকে শুরু করে পেট্রোল ডিজেলের দাম আকাশছোঁয়া ,  চাকরি ক্ষেত্র ক্রমশই সংকুচিত হচ্ছে ,  বেকারত্ব বাড়ছে । 
ইতিমধ্যেই দেশে অর্থনৈতিক মন্দাদশা শুরু হয়ে গেছে । 
এটা ঠিক যে  শ্রীলঙ্কার মত চরম, এবং সর্বাত্মক অর্থনৈতিক বিপর্যয় হয়ত ভারতে হবে না ।  কারণ ভারত অনেক বড় দেশ ।  ভারতের অর্থনীতির আকারও শ্রীলঙ্কা বা এইসব ছোট ছোট দেশের তুলনায় বড় ।  দেশের মধ্যে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করার ক্ষমতাও অনেক বেশী । 
ঠিক এই কারণেই তুরষ্কে বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতির হার ৭০% ছাড়িয়ে গেলেও,  খাদ্যে স্বনির্ভর হওয়ার কারণে  এখনও চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে পড়েনি । 
তবে অর্থনৈতিক সংকট যে অদূর ভবিষ্যতে আরও ঘনীভূত হবে এবং জনগণের ইতিমধ্যেই দুর্দশাগ্রস্থ জীবনকে আরও বিভীষিকাময় করে তুলবে তা বোঝার জন্য কোনও অর্থনীতিবিদ হওয়ার প্রয়োজন নেই । 
এই অর্থনৈতিক সংকট  এবং তা থেকে উদ্ভুত  রাজনৈতিক বিক্ষোভ যে নিজেদের গদি টালমাটাল করে দিতে পারে তা কেন্দ্র সরকারে আসীন ফ্যাসিবাদী শক্তি ভালো করেই বুঝতে পেরেছে।  তাই যেখানে সেখানে মসজিদের নীচে শিবলিঙ্গ  'খুঁজে' পাওয়া যাচ্ছে ।  মন্দির-মসজিদ বিতর্ক তুলে হিন্দুদের সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ করার চেষ্টা পুরোদমে চলছে । 
ভারতের জনগণকেই এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তাঁরা নিজেদের জীবনের সত্যিকার সমস্যা,  রুটি রুজি,  শিক্ষা স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তা করবেন,  না মন্দির-মসজিদ নিয়ে আরএসএস-বিজেপির তৈরী করা সাজানো সমস্যা নিয়ে উত্তেজিত হবেন ।  নিজেদের দেশকে আরেকটা শ্রীলঙ্কায় পরিণত হতে দেবেন । 

Comments

Popular posts from this blog

২১শে ফেব্রুয়ারি দীর্ঘজীবী হোক

আজ ২১শে ফেব্রুয়ারি । ১৯৫২ সালে আজকের দিনেই ঢাকায়,উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার বিরুদ্ধে এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে, আন্দোলনরত অবস্থায় পুলিশের নির্বিচার গুলিচালনায় সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার, শফিউর সহ অনেক ছাত্র ও যুবক শহীদ হন। অসংখ্য মানুষ আহত হন। এই মহান আন্দোলনই পরবর্তীকালে পূর্ব বাংলার মুক্তিযুদ্ধের সাংস্কৃতিক অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, অনেক প্রাণের বিনিময়ে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়। যদিও নানা বিশ্বাসঘাতকতা, নানা চক্রান্তের কারণে ভাষা শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন পুরোপুরি সফল হয়নি। বিপ্লবী, কমিউনিস্ট মুক্তিযোদ্ধারা যে স্বাধীন, জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন, মুজিবুর রহমান ও তার  আওয়ামী স্বৈরাচারী বাকশাল শাসন সেই স্বপ্নকে ধ্বংস করে দেয়। পরবর্তীকালে, কখনও আওয়ামী লীগ অথবা  বিএনপি-জামাত,  কখনও বা এরশাদের জাতীয় পার্টি কিংবা ১/১১-র  সেনা শাসনের সময়ে বাংলাদেশের জনগণকে স্বৈরাচারী শাসনের মুখোমুখি হতে হয়েছে। কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের নেতৃত্বে জনগণের মুক্তির লড়াই জারী থেকেছে।  কিন্তু স্বাধীন, জনগণতান্ত্রি...

'আদানি কান্ড' আবার একবার ভারতীয় বৃহৎ বুর্জোয়াদের মুৎসুদ্দি চরিত্র প্রমাণ করলো

'আজকাল অনেকেই বলে থাকেন যে ভারতবর্ষে নাকি পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটে গেছে। বর্তমান ভারতীয় সমাজ একটা  পুঁজিবাদী সমাজ। ভারতের রাষ্ট্র একটা জাতীয় বুর্জোয়া রাষ্ট্র । এর সপক্ষে তাঁরা যুক্তি দেন যে আম্বানি,আদানি,টাটার মত ভারতীয় বৃহৎ বুর্জোয়ারা পৃথিবীর সর্বোচ্চ ধনীদের তালিকায় প্রথম সারিতে পৌঁছে গেছে। এরা ইউরোপ আমেরিকার বিভিন্ন পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী দেশে অনেক বড়ো বড়ো কোম্পানি কিনছে। যেমন টাটারা ২০০৭ সালে ইউরোপ তথা পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ইস্পাত প্রস্তুতকারক  কোম্পানি কোরাসের মালিকানা নিজেদের দখলে নিয়েছিল। এই উদাহরণ দিয়ে তো অনেকে আবার এটাও প্রমাণ করতে চান যে ভারতের বুর্জোয়ারা তথা ভারতের রাষ্ট্র সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র অবধি অর্জন করে ফেলেছে !! তাঁরা বলেন,  মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া বলে আসলে কিছু নেই ভারতে। কিছু মতান্ধ, বাস্তবজ্ঞানবর্জিত  নকশাল নাকি সেকেলে মুৎসুদ্দি বুর্জোয়ার তত্ত্ব ধরে রেখেছে। একথা যে কতখানি ভুল তা সাম্প্রতিক আদানি কান্ডে আবার প্রমাণিত হল। আদানি বা এদের মত ভারতীয় বৃহৎ বুর্জোয়ারা  মূলত নানা ধরনের জোচ্চুরি, জালিয়াতি, ফাটকা ইত্যাদির মাধ্যমে নিজেদের সম্পদের পাহাড় গড়ে ত...